রোবটিকে স্বর্ণ জয়ের সমতায় বাংলাদেশ
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম রচিত ‘বিশ্বে যা কিছু কল্যাণকর অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ পংক্তির বাস্তব প্রতিফল পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিলো বিশ্ব। টেক-সই প্রযুক্তির রোবট উদ্ভাবনের মাধ্যমে একই ক্যাটাগরিতে দুইটি স্বর্ণপদক জয় করলো বাংলাদেশ। দেশের সফল রোবটিক দল টিম অ্যাটলাস এবং দেশের প্রথম নারী রোবটিক দল কোড ব্লাক একই মঞ্চে ওড়ালো লাল-সবুজের পতাকা।
পল্লী কবি জসিমউদ্দিনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি রেসকিউ রোবট ‘প্রহরী’ নিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইন্দোনেশিয়া জয় করে টিম অ্যাটলাস থেকে সৃষ্টি স্বতন্ত্র্য নারী দলটি। প্রথম বিদেশ সফরেই তাক লাগিয়ে দিলো ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের জান্নাতুল ফেরদৌস ফ্যাবিনের দল। এই দৌড়ের অপর সদস্যরা হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান সিনহা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নওরিন ও সানিয়া ইসলাম সারা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের দ্বিতীয় ববর্ষের তাহিয়া রহমান।
একই মঞ্চে সৌরশক্তি চালিত স্ব-চালিত জলজ রোবট নিয়ে হাজির হয়েছিলেন টিম এটলাস দলনেতা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানি জুবায়ের। এই উদ্ভাবনে তার সতীর্থ ছিলেন ঢাকা কলেজের আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, দাউদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আতিক শাহরিয়ার হাসা এবং নির্ঝর ক্যান্টঃ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র মোঃ মারুফ মিয়া ও মোঃ আল মাহমুদ আলিফ। সাগরের নীল জলরাশিতেও এই বোটটি যেন পানির ময়লা নিষ্কাষণ করতে পারে সেজন্যই হয়তো নাম দেয়া হয় ব্লু-বট। দূষণ রোধী ও পরিবেশ বান্ধব রোবটটি তৈরির সময় আকাশের নীলে মিশে জলাশয়ের পানীও নীলচে দেখায় বলেই হয়তো রঙহীন পথে চলা যানটির গায়েও দেয়া হয়েছে নীল রঙের প্রোলেপ। রঙ যাই হোক না কেনো ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সায়েন্স, এনভারনমেন্ট এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিযোগিতায় (ডব্লিউএসইইসি) নীল বট কিংবা কালো দলের প্রহরী রেঙেছে সোনালী দ্যুতিতে। বাংলাদেশের নারী-পুরুষের দুই দল হাতে হাত; কাঁধে কাঁধ রেখে জয় করেছে স্বর্ণ পদক।
প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৮টি দেশ থেকে মোট ৩১১টি দল অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের ব্লাক ছাড়াও এই ইভেন্টের রসায়ন বিভাগে সিলভার জয় করেছে ইন্দোনেশিয়ারই একটি নারী দল। তবে বিদেশ থেকে অংশ নিয়ে একমাত্র স্বর্ণ জয়ী দল বাংলাদেশের কোড ব্লাক।
রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে গড়ে তোলা রিসার্চ ল্যাবেই জন্ম ও বেড়ে উঠেছে রোবট দুটর। এর মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা সহ নকশি কাঁথার বিভিন্ন ফোড়ের ডিজাইনের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে রোবট প্রহরীর অবয়বে। রোবট প্রহরী কিন্তু মোটেই আক্ষরিক অর্থের দারোয়ান টাইপের কিছু নয়। কেননা সে সে একইসঙ্গে আগুন নেভানো, ফাস্টএইড কিটস বহন করা এবং ভূমিকম্পে উদ্ধার কাজেও অংশ নিতে পারে। রোবটের মুন্সিয়ানা বলতে গিয়ে ব্লাক দলনেতা জান্নাতুল ফেরদৌস জানালেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) এই রোবটটি একইসঙ্গে ইমেজ প্রসেসিং, বাস্তব সময়ে ভিজ্যুয়াল ডেটা বিশ্লেষণ, বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং বিপজ্জনক অবস্থা মূল্যায়ন করে অনায়াসে বৈরী পরিবেশে চলাচল করতে পারে। বহন করতে পারে ৮০ কেজি ওজনের বস্তু। তবে এই ওজনদার রোবট নিয়ে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জও ফেইস করতে হয়েছে টিম ব্লাক-কে। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে জান্নাতুল ফেরদৌস বললেন, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আমরা অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছি। প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিল দেশ থেকে পার্টস খুলে প্যাক করে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় সেগুলো অ্যাসেম্বল করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। এয়ারপ্লেনে প্রেসারের কারণে এবং অতিরিক্ত চাপে মেটাল রোবটের কিছু অংশ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে রোবটের অংশগুলো সেট করার সময় বিপাকে পড়তে হয়। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে অন্য আঙ্গিকে রোবটটি সেট করা হয়। এছাড়াও দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া কিছু যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সেগুলোর পরিবর্তে একই কাজ করবে এমন অন্য যন্ত্র ম্যানুয়ালি বানিয়ে রোবটে লাগানো হয়েছে। স্বর্ণজয় করে এখন সব কষ্টই পানি হয় গেছে।
অপরদিকে মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে নিরাপদ রাখার প্রত্যয়ে পানি দামল রোবট কারিগররা প্রমাণ দিলো তাদের তৈরি দূষণ প্রতিরোধী স্বয়ংক্রিয় ব্লু-বট। ৫ বাই ৩ ফুট আকারের এই ওয়াটার বোটটি পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। নদী কিংবা পুকুরের কচুরি পানা, শ্যাওলা কিংবা ভাসপান কোনো ময়লা থাকলে তা যেমন নিজের পেটে পুরে পানির আবর্জনা পরিষ্কার করে একই ভাবে পানি বিষুদ্ধকরণ ক্যাপ্সুল ও হ্যালোজেন টিউব দিয়ে পানি শোধন করতেও সমান পারঙ্গম। সৌর শক্তিতে চলতে পারে বিধায় মাঝ পথে শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও নেই বললেই চলে। বটটি নদীর পাশের যেসব কল কারখানা পানি দূষণ করে স্বয়ংক্রিয় ভাবে পানি পরীক্ষা করে সেগুলো চিহ্নিত করতে পারে। একই সঙ্গে নাদীতে ট্রলার আটকে গেলে সার্ভিলেন্স বোট এবং ১০ কোজি পর্যন্ত ওজনের ত্রাণ বহন করতে পারে। এছাড়াও ১০ মিটার পর্যন্ত এলাকার মধ্যে সোনার ডিটক্টর দিয়ে চর চিহ্নিত করে জলযানগুলোকে আগাম সতর্ক করার সক্ষমতাও এটির রয়েছে। একেবারে নিজেদের অর্থায়নে এই বটটি প্রস্তুত করার কারণ হিসেবে টিম অ্যাটলাস দলনেতা সানি জুবায়ের বললেন, নদী মাতৃক বাংলাদেশের পানিতে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। এর জন্য কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার নেই। পানি সম্পদ রক্ষা করতেই আমরা ব্লু বট ডিজাইন করি। আর্থিক টানাপোড়েন উৎরে ওভার ক্লকস্পিডে সবটাই প্রমাণ দিতে পেরেছি প্রতিযোগিতায়। উড়িয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। এই আনন্দে উড়ে গেছে সব সীমবদ্ধতা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।
ফুরফুরে মেজাজে দেশে ফিরেই বিজয়ীনীরা মনোযোগী হয়েছে ভার্টিক্যাল ফার্মিং এর জন্য এমন একটি রোবট বানাতে যেটি বাড়ির আঙিনাতে ফসল ফলাতে সাহায্য করবে কৃষাণীকে। এক কথায় অল্প স্থানে বেশি ফসল ফলানো বা জুম চাষে ব্যবহৃত হবে। তখন আমরা আবারো কাজী দা’র কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইবো- হে মোর রাণি! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে। আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে। অবশ্য ক্ষান্ত হয়নি দামালেরাও। নতুন উদ্যোমে তারা নেমেছে স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট চাষাবাদের সুযোগ করে দিয়ে কৃষাণের বিজয় কেতন ওড়াতে। খেতে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রের আধুনিকায়নে মগ্ন টিম অ্যাটলাস। এজন্য লাঙ্গল-জোয়ালে আইওটি সেন্সর যুক্ত করা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবেশ দূষণে দায়ী উপকরণ নবায়নযোগ্য করা যায় তা নিয়েই চলছে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ। এই কাজে সফল হয়ে পরিবেশের বৈশ্বিক ঝুঁকি রোধেও হয়তো তারা ওড়াবে বিজয়ের নতুন কেতন। তখন বিশ্বকবি রবী ঠাকুরের ভাষায় বুক চেতিয়ে আমরা সমস্বরে গাইবো- ওই যে তাহার বিশ্ব-চেতন কেতন-আগে
জ্বলছে নূতন দীপ্তিরতন তিমির-মথন শুভ্ররাগে;
মশাল-ভস্ম লুপ্তি-ধুলায় নিত্যদিনের সুপ্তি মাগে।
আনন্দলোক দ্বার খুলেছে,
আকাশ পুলক-ময়--
জয় ভূলোকের, জয় দ্যুলোকের, জয় আলোকের জয়।







